★ভারতের মৃত্তিকা সংক্রান্ত সাধারণ তথ্য★
*The Indian Council of Agricultural Research(ICAR) বা ভারতীয় কৃষি গবেষণা বিভাগ 1953 সালে জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য, উৎপত্তি, স্বাভাবিক উদ্ভিদ ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে ভারতের মাটিকে 8টি প্রধান শ্রেণিও 26 টি উপ বিভাগে বিভক্ত করে।যথা-1) পলিমাটি,2) কৃষ্ণ মৃত্তিকা ,3) ল্যাটেরাইট মাটি, 4) লোহিত মাটি,5) লবণাক্ত ও ক্ষারীয় মাটি, 6) পার্বত্য মাটি,7) মরু অঞ্চলের মাটি এবং 8)জলাভূমির মাটি।
*উত্তরাখণ্ড রাজ্যের দেরাদুনে ভারতের মাটি গবেষণাগার অবস্থিত।
*ভারতের কৃষি গবেষণা বিভাগ (ICAR)- এর অধীনস্থ'
National Bureau of Soil Survey and Land Use Planning'-এর সদর দফতর মহারাষ্ট্রের নাগপুরে অবস্থিত।
মৃত্তিকা শ্রেণীবিভাগ
মৃত্তিকা ছয় প্রকার:
🌍 ১)পলি মৃত্তিকা-
📖অবস্থান ও বন্টন-ভারতের মোট আয়তনের প্রায় 46% (প্রায় 7.7 লক্ষ বর্গকিমি) অঞ্চল জুড়ে পলিমাটি অবস্থান করছে। এদেশের পশ্চিমে পাঞ্জাব থেকে পূর্বে অসম পর্যন্ত বিস্তৃত সমভূমি অঞ্চলে এই প্রকার মৃত্তিকা দেখা যায়। এছাড়া মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী, নর্মদা, তাপ্তি প্রভৃতি নদী অববাহিকা এবং পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চলে কোন মৃত্তিকা দেখা যায়।
📖উৎপত্তি-হিমালয় পর্বতের পাললিক শিলা এবং দক্ষিণ ভারতের মালভূমি ও বিভিন্ন উচ্চভূমির কঠিন শিলা ক্ষয় করে বিভিন্ন নদনদী সমূহ তাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সঞ্চয়ের দ্বারা পলি মৃত্তিকা সৃষ্টি করে।
📖উপবিভাগ-আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে পলি মৃত্তিকা পাঁচ ধরনের হয়। যথা-
ক)খাদার-নদী তীরবর্তী অঞ্চলের নবীন পলি মৃত্তিকাকে খাদার বলে।
খ)ভাঙ্গর-নদী থেকে দূরবর্তী অঞ্চলের প্রাচীন পলি মৃত্তিকাকে ভাঙ্গর বলে।
গ)ভাবর-পর্বতের পাদদেশীয় অঞ্চলের নুড়ি, কাঁকর মিশ্রিত অনুর্বর মৃত্তিকাকে ভাবর বলে।
ঘ)ধাঙ্কার-উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের জলাভূমির মৃত্তিকাকে ধাঙ্কার বলে।
ঙ)কঙ্কর-ভাঙ্গড় অঞ্চল দানা যুক্ত মৃত্তিকাকে কঙ্কর বলে।
📖বৈশিষ্ট্য-
১)পলি মৃত্তিকার পলি, বালি ও কাদার ভাগ বেশি থাকে।
২)সুষম গ্রথন যুক্ত বলে পলি মৃত্তিকার জল ধারণ ক্ষমতা বেশি হয়।
৩)এই মৃত্তিকায় নাইটোজেন ও জৈব পদার্থের পরিমাণ কম থাকলেও ফসফরাস ও পটাশিয়ামের পরিমাণ বেশি।তাই এই মৃত্তিকা উর্বর ও কৃষি কাজের উপযোগী।
৪)এই মৃত্তিকার রং গাঢ় হয়।
📖উৎপাদিত ফসল-অত্যন্ত উর্বর বলে পলি মৃত্তিকায় প্রায় সব ধরনের ফসল বিশেষত ধান, গম, পাট, আখ, আলু, শাকসবজি ও বিভিন্ন ধরনের তৈলবীজ চাষ কর
🌍২)কৃষ্ণ মৃত্তিকা(রেগুর মৃত্তিকা) black cotton soil:
📖অবস্থান ও বন্টন-ভারতের মোট আয়তন প্রায় 17% (প্রায় 5.5 লক্ষ বর্গ কিমি) অঞ্চল অবস্থান করছে।এদেশের দাক্ষিণাত্য অঞ্চলের অন্তর্গত মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশের পশ্চিমাংশ, গুজরাটের দক্ষিণাংশ, অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশ এবং কর্নাটক ও তামিলনাড়ুর দেখা যায়।
📖উৎপত্তি-স্বল্প বৃষ্টিপাতের প্রভাবে কালো রঙের লাভা গঠিত ব্যাসল্ট শিলা থেকে কৃষ্ণ মৃত্তিকার উৎপত্তি হয়েছে।
📖বৈশিষ্ট্য-
১)ব্যাসল্ট শিলা থেকে সৃষ্টি হয়েছে বলে এবং টাইটানিয়াম অক্সাইড ও বিভিন্ন জৈব যৌগের পরিমাণ বেশি থাকে বলে কৃষ্ণ মৃত্তিকার রং কালো হয়।
২)কাদার ভাগ বেশি ও বালির ভাগ কম থাকায় কৃষ্ণ মৃত্তিকার জল ধারণ ক্ষমতা খুব বেশি হয়।
৩)বর্ষাকালে কৃষ্ণ মৃত্তিকা চটচটে হয়,।
৪) শুষ্ক ঋতুতে জলের অভাবে এই মৃত্তিকা শক্ত হয়ে যায় এবং মৃত্তিকাতে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়।
৫)কৃষ্ণ মৃত্তিকায় ফসফরাস ও নাইট্রোজেনের ঘাটতি থাকলেও প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন অক্সাইড, অ্যালুমিনা ইত্যাদি উপস্থিত থাকে। এই মৃত্তিকা খুব উর্বর হয়।
📖উৎপাদিত ফসল-কার্পাস বা তুলো, তামাক, তৈলবীজ, ইক্ষু, জোয়ার, পেঁয়াজ, কমলালেবু ও বিভিন্ন খাদ্য শস্য হল কৃষ্ণ মৃত্তিকা উৎপাদিত উল্লেখযোগ্য ফসল।কৃষ্ণ মৃত্তিকায় কার্পাস বা তুলো প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয় বলে একে কৃষ্ণ কার্পাস মৃত্তিকা বা 'Black Cotton Soil' বলা হয়।
🌍৩)লোহিত মৃত্তিকা-
📖অবস্থান ও বন্টন-ভারতের মোট আয়তনের প্রায় 11% (প্রায় 3.5 লক্ষ বর্গ কিমি) অঞ্চল জুড়ে লোহিত মৃত্তিকা অবস্থান করছে। এদেশের কর্ণাটক, মহারাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাংশ, অন্ধপ্রদেশের পূর্বাংশ, মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড ও উত্তরপ্রদেশের দক্ষিণাংশ এবং উত্তর পূর্ব ভারতের অন্তর্গত নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় রাজ্যে এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম ও বাঁকুড়া জেলায় লোহিত মৃত্তিকা দেখা যায়।
আ)উৎপত্তি-অধিক উষ্ণতা ও আর্দ্রতার প্রভাবে প্রাচীন আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে লোহিত মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়েছে।
📖বৈশিষ্ট্য-
১)লোহিত মৃত্তিকায় লৌহের পরিমাণ বেশি থাকায় ইহা লাল রঙের হয়। তবে কখনো কখনো এই মৃত্তিকার রং হলুদ ও বাদামি ধূসর বর্ণেরও হয়ে থাকে।
২)এই মৃত্তিকায় ফসফরাস, পলি ও বালির ভাগ বেশি থাকলেও নাইটোজেন, ক্যালসিয়াম ও জৈব পদার্থের পরিমাণ খুব কম।তাই এই মৃত্তিকা অনুর্বর।
৩)এই মৃত্তিকার সচ্ছিদ্রতা খুব বেশি এবং জল ধারণ ক্ষমতা খুব কম।
📖উৎপাদিত ফসল-লোহিত মৃত্তিকা অনুর্বর হলেও এই মৃত্তিকায় তামাক, চিনাবাদাম, সোয়াবিন, ভুট্টা, ইক্ষু, আঙুর ইত্যাদি ফসল চাষ করা হয়।
🌍৪)ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা-
📖অবস্থান ও বন্টন-ভারতের মোট আয়তনের প্রায় 8% (প্রায় 2.5 লক্ষ বর্গ কিমি) অঞ্চল জুড়ে ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা অবস্থান করছে।এদেশের পশ্চিমঘাট পার্বত্য অঞ্চল, অসমের পার্বত্য অঞ্চল, মেঘালয় মালভূমি ও ছোটনাগপুর মালভূমি,, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু অঞ্চল।
📖উৎপত্তি-ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে উচ্চভূমির আবহবিকারগ্রস্ত প্রাচীন শিলাস্তর থেকে সিলিকা ও অন্যান্য পদার্থ অপসারিত হয়ে যায় এবং লৌহা ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড পড়ে থাকে। এই লৌহ ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড বায়ুর সংস্পর্শে ল্যাটেরাইজেশন প্রক্রিয়ায় জমাট বেঁধে ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়।
📖বৈশিষ্ট্য-
১)ল্যাটেরাইট মৃত্তিকায় লোহার ভাগ বেশি থাকে বলে ইহা ইঁটের মতো লাল রঙের হয়।
২)ল্যাটেরাইট মৃত্তিকায় নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও জৈব পদার্থের পরিমাণ খুব কম থাকে বলে এই মৃত্তিকা অনুর্বর হয়।
৩)কাঁকরে পরিপূর্ণ বলে এই মৃত্তিকার জল ধারণ ক্ষমতা খুব কম।
৪)এই মৃত্তিকার গঠন বা আকৃতি অনেকটা মৌচাকের মতো হয়।
📖উৎপাদিত ফসল-জল ধারণ ক্ষমতা কম ও অনুর্বর হওয়ার কারণে ল্যাটেরাইট মৃত্তিকায় কৃষিকাজ বিশেষ হয়না। তবে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে ও জলসেচের সাহায্যে এই মৃত্তিকায় চিনাবাদাম, ভুট্টা, রাগি, রবার ইত্যাদি ফসল চাষ করা যায়।
🌍৫)মরু মৃত্তিকা-
📖অবস্থান ও বন্টন-ভারতের মোট আয়তনের প্রায় 4.5% (প্রায় 1.50 লক্ষ বর্গ কিমি) অঞ্চল জুড়ে মরু মৃত্তিকা অবস্থান করছে।এদেশের পশ্চিম রাজস্থান, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা দক্ষিণাংশ এবং গুজরাটের কচ্ছের রান অঞ্চলে মরু মৃত্তিকা দেখতে পাওয়া যায়।
📖উৎপত্তি-স্বল্প বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে যান্ত্রিক আবহবিকারের প্রভাবে বেলেপাথর জাতীয় শিলাস্তর থেকে মরু মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়।
📖বৈশিষ্ট্য-
১)স্বল্প বৃষ্টিপাত ও অধিক বাষ্পীভবন যুক্ত অঞ্চলে অধিক বাষ্পীভবনের কারণে কৈশিক প্রক্রিয়ায় ভূ-অভ্যন্তরের লবণ উপরে উঠে এসে মৃত্তিকা স্তরে সঞ্চিত হয় বলে এই মৃত্তিকা লবণাক্ত হয়।
২)এই মৃত্তিকা বাদামি হলুদ বা হালকা হলুদ বর্ণের হয়।
৩)বালির ভাগ বেশি বলে এই মৃত্তিকার জল ধারণ ক্ষমতা কম।
৪)মরু মৃত্তিকা অধ্যুষিত অঞ্চল উদ্ভিদ বিরল বলে এই মৃত্তিকায় নাইট্রোজেন ও জৈব পদার্থের পরিমাণ কম থাকে। তাই এই মৃত্তিকা অনুর্বর।
📖উৎপাদিত ফসল- এই মৃত্তিকায় গম, যব, মিলেট, কার্পাস, ডাল, তৈলবীজ ইত্যাদি ফসল চাষ করা হয়।
🌍৬)পার্বত্য ও অরণ্য মৃত্তিকা-
📖অবস্থান ও বন্টন-ভারতের মোট আয়তনের প্রায় 8.7% (প্রায় 2.85 লক্ষ বর্গ কিমি) মেঘালয় মালভূমি অঞ্চলে, উত্তরপ্রদেশের তরাই অঞ্চলে, জম্মু ও কাশ্মীর এবং হিমাচল প্রদেশের পার্বত্য উপত্যাকায় এই ধরণের মৃত্তিকা দেখা যায়।এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চল।
📖উৎপত্তি-শীতল পার্বত্য অঞ্চলে সরলবর্গীয় বৃক্ষের ডালপালা, লতাপাতা ইত্যাদি পচে গিয়ে শিলা চূর্ণের সাথে সংযুক্ত হয়ে পার্বত্য ও অরণ্য মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়।
📖বৈশিষ্ট্য-
১)পার্বত্য ও অরণ্য মৃত্তিকায় জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে।
২)বিভিন্ন আকৃতির নুড়ি, কাঁকর, বালি ইত্যাদির পরিমাণ বেশি থাকে বলে এই মৃত্তিকার জল ধারণ ক্ষমতা খুব কম।
৩) এই মৃত্তিকা ধূসর বাদামি বা কালচে বর্ণের হয়।
৪)জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকলেও পটাশ, ফসফরাস ও ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কম বলে এবং জল ধারণ ক্ষমতা কম বলে এই মৃত্তিকা অনুর্বর ও কৃষিকাজের অনুপোযোগী হয়।
📖উৎপাদিত ফসল-অনুর্বর হওয়া সত্বেও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে এই মৃত্তিকায় চা, কফি, বিভিন্ন ধরনের মশলা ও ফল চাষ করা হয়।
মন্তব্যসমূহ