১) ভারতের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
অথবা,
ভারতের জলবায়ুর বৈচিত্র্য আলোচনা করো।
মৌসুমি বায়ু শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘মনসুন’ (Monsoon) মূলত আরবি শব্দ ‘মাওসিম’ (مَوْسِمٌ) বা মালয়লম শব্দ 'মনসিন'(Monsin) থেকে এসেছে। ‘মাওসিম’ শব্দের অর্থ ঋতু বা কাল।
মৌসুমি শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী 'এডমন্ড হ্যালি'(১৬৫৬)।
(১) মৌসুমি বায়ুর অত্যধিক প্রভাব :
ভারতের জলবায়ুর ওপর মোসুমি বায়ুর প্রভাব সর্বাধিক। ঋতু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের বণ্টন, বায়ু প্রবাহ, উম্মতার পরিবর্তন, প্রভৃতি মৌসু বায়ুর আগমন ও প্রত্যাগমনের ওপর নির্ভর করে।
(2) ঋতু পরিবর্তন :
ভারতের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ঋতু পরিবর্তন। মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রত্যাগমনের ওপর ভিত্তি করে ভারতে প্রধান চারটি ঋতু চক্রাকারে আবর্তি হয়।
যেমন-
(i) গ্রীষ্মকাল - মার্চ থেকে মে, (GMAMA)
(ii) বর্ষাকাল- জুন থেকে সেপ্টেম্বর, (BJUSA)
(iii) শরৎকাল- অক্টোবর থেকে নভেম্বর, (SON)
(iv) শীতকাল-ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।(SDF)
এছাড়া শীরে আগে ও শীতের পরে রয়েছে নাতিদীর্ঘ (v) হেমন্তকাল ও (vi) বসন্তকাল।
(৩) বৃষ্টিপাতের অসম বণ্টন :
ভারতের মোট বৃষ্টিপাতের ৯০% ঘটে মৌসুমি বায়ু প্রভাবে। যেহেতু এই বায়ু সর্ব স্থানে সমানভাবে বিচরণ করে না তাই বৃষ্টিপাতের আঞ্চলির বৈষম্যও প্রকট। উত্তর-পূর্ব ভারতে যেখানে গড় বৃষ্টিপাত ৩০০-৩৫০ সেমি (মৌসিনরামে ১,৩৫০ সেমি) সেখানে মধ্য ভারতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গড়ে ১০০ - ১৫০ সেমি এবং রাজস্থানে ৫০ সেমির কম।
(৪) অনিশ্চিত ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত :
মৌসুমি বায়ু খামখেয়ালি প্রকৃতির হওয়ায় ভারতের বিভিন্ন অংশে সব বছর সমানভাবে বৃষ্টিপাত ঘটে না। কখনও অতি-বৃষ্টির ফলে বন্যা, আবার কখনও কখনও অনাবৃষ্টির কারণে খরার সৃষ্টি হয়। মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রত্যাগমন অত্যন্ত অনিশ্চিত।
(৫) আর্দ্র-গ্রীষ্মকাল ও শুষ্ক-শীতকাল :
ভারতে মৌসুমি বায়ুর আগমনে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয়। ফলে বাতাসে আর্দ্রতা এই সময় বেশি থাকে৷ শীতকালে মৌসুমি বায়ু স্থলভাগ থেকে প্রত্যাগমন করে বলে জলবায়ু শুষ্ক প্রকৃতির।
(৬) সময় ও স্থান ভেদে উষ্মতার পরিবর্তন :
(i) এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত সূর্যরশ্মি এই অঞ্চলে লম্বভাবে পড়ে বলে গড় উষ্ণতা বেশি (৩২° -৩৭° সেলসিয়াস) হয়। রাজস্থানে এই সময় উষ্ণতা ৪৮° সেঃ পর্যন্ত উঠে যায়।
(ii) ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়ে বলে উষ্ণতা কম (১৫°– ২০° সেঃ) থাকে।
(iii) জুন মাসের পর থেকে মৌসুমি বায়ুর আগমনের ফলে উষ্ণতা হঠাৎ কমে যায়।
(iv) ভারতের পূর্বে ও পশ্চিমে সমুদ্র অবস্থান করায় উপকূল বরাবর সারাবছর সমভাবাপন্ন আবহাওয়া থাকে।
(v) অধিক উচ্চতার কারণে হিমালয় পার্বত অঞ্চলে শীতল অবস্থা বিরাজ করে। শীতকালে হিমালয় অঞ্চলে তুষারপাত হয়।
(৭) ঋতুকালীন বায়ুপ্রবাহ :
মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রত্যাগমন দ্বারা বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই গ্রীষ্মকালে ভারতে দক্ষিণ থেকে উত্তরে এবং শীতকালে উত্তর থেকে দক্ষিণ বায়ুপ্রবাহ ঘটে। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বায়ুপ্রবাহের দিক প্রায় ১৮০° পরিবর্তিত হয়।
(৮) স্থানীয় বায়ুর প্রভাব :
বিভিন্ন প্রকার স্থানীয় যেমন - ভারতে কালবৈশাখী, - উত্তর-পশ্চিম ভারতে লু ও আঁধি স্থানীয়ভাবে আবহাওয়া ও জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে।
(৯) দক্ষিণ ও উত্তর ভারতে জলবায়ুর বৈষম্য:
ভারতের দক্ষিণ অংশ নিম্ন অক্ষাংশে ও সমুদ্রের নিকটে অবস্থিত হওয়ায় জলবায়ু কিছুটা উষ্ণ কিন্তু সমভাবাপন্ন প্রকৃতির। ভারতের মধ্য উত্তর অংশ সমুদ্র থেকে দূরে অবস্থান করায় জলবায়ুর মধ্যে চরমভাব লক্ষ করা যায়।
২) ভারতের মৌসুমী জলবায়ুর নিয়ন্ত্রক সমূহ আলোচনা করো।
সুবিশাল বিস্তৃতির কারণে ভারতের জলবায়ু বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। জলবায়ু নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতিতেই জলবায়ু বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিয়ন্ত্রকগুলি হল -
(১) অক্ষাংশ:
ভারতের অবস্থান প্রায় ৮°৪' উত্তর থেকে ৩৭°১৭′ উত্তর অক্ষরেখার মধ্যে। কর্কটক্রান্তি রেখা (২৩°৩০′ উঃ) ভারতের প্রায় মাঝবরাবর বিস্তৃত। কর্কটক্রান্তিরেখার দক্ষিণ অংশ ক্রান্তীয় মণ্ডলে এবং উত্তর অংশ নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলে অবস্থিত।
(২) উচ্চতা :
ভূমির উচ্চতা ভারতের জলবায়ুর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক। যেহেতু উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উম্মতা ৬.৪° সেঃ হারে হ্রাস পায়, তাই গাঙ্গেয় সমভূমির তুলনায় সুউচ্চ হিমালয় অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা সারাবছর অনেক কম থাকে। শীতকালে হিমালয় অঞ্চলে তুষারপাত হয়।
(৩) পর্বতের অবস্থান :
পর্বত ভারতের উষ্ণতাকে নিয়ন্ত্রণ করে, বায়ুপ্রবাহকে বাধা দেয় এবং বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে। ভারতের উত্তরে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতের অবস্থানের জন্যই শীতকালে মধ্য এশিয়ার অতিশীতল বায়ু ভারতে প্রবেশ করতে পারে না। মৌসুমি বায়ু হিমালয়ের দক্ষিণ ঢালে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটায়। ওদিকে দক্ষিণ ভারতে পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢালে মৌসুমি বায়ু বাধাপ্রাপ্ত হয়ে প্রবল বৃষ্টিপাত মৌসুমি বায়ুর বিস্ফোরণ ঘটায়।
৪) হিমালয়ের প্রভাব :
ভারতের উত্তরে ২,৫০০ কিমি দীর্ঘ এবং গড়ে ৪,০০০ মি উচ্চতা বিশিষ্ট ধনুকাকৃতির হিমালয় পর্বত ভারতের জলবায়ুকে বিভিন্ন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
(i) অধিক উচ্চতার কারণে উপক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও হিমালয়ের জলবায়ু শীতল নাতিশীতোষ্ণ প্রকৃতির। কোনো কোনো অংশের জলবায়ু অত্যন্ত শীতল।
(ii) হিমালয় পর্বতের অবস্থানের ফলে মধ্য এশিয়ার অতি শীতল বায়ু ভারতে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে শীতকালে ভারত অধিক শৈত্যের হাত থেকে রক্ষা পায়।
(iii) হিমালয়ের দক্ষিণ ঢালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাধাপ্রাপ্ত হয়ে শৈলোৎক্ষেপ পদ্ধতিতে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটায়। তাই ভারতীয় উপমহাদেশে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি।
(iv) মৌসুমি বায়ুর উৎপত্তিতেও পরোক্ষভাবে হিমালয়ের প্রভাব রয়েছে।
(৫) সমুদ্রের অবস্থান :
দক্ষিণ ভারতের তিন দিক সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় উপকূলের জলবায়ু সমভাবাপন্ন। সামুদ্রিক ঘূর্ণবাতের প্রভাবে সমুদ্র উপকূলে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়।
(৬) সমুদ্র থেকে দূরত্ব :
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারত সমুদ্র থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় সামুদ্রিক বায়ুর প্রভাব কম। তাই জলবায়ু চরম ভাবাপন্ন অর্থাৎ শীত ও গ্রীষ্মের মধ্যে প্রসার খুব বেশি। তাছাড়া উপকূল থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কম।
(৭) মৃত্তিকা :
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৃত্তিকা ভারতের জলবায়ুকে বিভিন্ন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। মরুভূমি অঞ্চলের বালি মাটি অতি দ্রুত উত্তপ্ত হয় বলে গ্রীষ্মকালে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের তুলনায় গড় উষ্মতা বেশি থাকে।
মন্তব্যসমূহ