গুজরাট রাজ্য [THE GUJARAT STATE ]
ভূমিকা : গুজরাটের ইতিহাস খ্রীষ্টের জন্মেরও প্রায় ২০০০ বছর আগে শুরু হয়। কথিত আছে যে, এই সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মথুরা ত্যাগ করে ভারতের পশ্চিম উপকূলবর্তী সৌরাষ্ট্রে এসে রাজ্যস্থাপন করেন, পরে যা ‘দ্বারকা' নামে পরিচিত হয়। এরপর গুজরাটে মৌর্য, গুপ্ত ও প্রতিহার রাজবংশের শাসন চলে। অবশেষে চালুক্য (সোলাঙ্কী) রাজবংশের আমলে গুজরাটের অগ্রগতি ও প্রাচুর্য তুঙ্গে ওঠে, যা গজনীর সুলতান মামুদের আক্রমণের পরেও বহুলাংশে অক্ষুণ্ণ থাকে। এরপর সুলতানী, মোগল, মারাঠা এবং ব্রিটিশ শাসনের সময় এই রাজ্যকে নানারকম সমস্যার মুখে পড়তে হয়।
→ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও গুজরাট রাজ্যের যথেষ্ট অবদান রয়েছে—জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী-ও গুজরাট রাজ্যেরই অধিবাসী ছিলেন।
→ ব্রিটিশ আমলে গুজরাট ব্রিটিশ শাসনাধীন এবং দেশীয় রাজাদের অধীন এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিল। স্বাধীনতার পর ভারতীয় রাজ্য পুনর্গঠনের সময় গুজরাটের ব্রিটিশ শাসনাধীন অংশটি সৌরাষ্ট্র ও কচ্ছ রাজ্যসহ তৎকালীন বোম্বাই রাজ্যের অধীনে আসে।
→ ১৯৬০ সালের মে মাসে গুজরাট রাজ্যটি এখনকার আকার প্রাপ্ত হয়। বর্তমানে গুজরাটি ভারতের একটি অত্যন্ত বিকাশশীল ও সমৃদ্ধ রাজ্য।
→ আমেদাবাদ শহরের কাছে অবস্থিত গান্ধীনগর গুজরাটের রাজধানী।
২০০১ সালে ২৬শে জানুয়ারী এক বিধ্বংশী ভূমিকম্পে গুজরাট রাজ্যের ভূজ, আনজার, রাপার, ভাচাউ, আমেদাবাদ, রাজকোট, বোলারি, গান্ধীধাম, লাকদিয়া, হাদোই, ডানদিয়া, সোমাকালি, মাদপুর, বন্দগ্রাম অঞ্চলের বহুস্থান সম্পূর্ণ ধ্বংশস্তূপে পরিণত হয় এবং প্রায় (দেড়লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়। রিক্টার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মান ছিল ৬.১।
[ ১ ] অবস্থান : গুজরাট রাজ্য মোটামুটিভাবে ২০°২৫° উত্তর অক্ষাংশ এবং ৬৮.৭ – ৭৪°৩০ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।
[২] সীমা ও আয়তন : গুজরাট রাজ্যের উত্তরে রাজস্থান রাজ্য ও পাকিস্তান; দক্ষিণে আরব সাগর ও মহারাষ্ট্র রাজ্য; পশ্চিমে আরব সাগর, কচ্ছ ও কাম্বে উপসাগর এবং পূর্বে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র রাজ্য অবস্থিত। গুজরাট রাজ্যের আয়তন ১,৯৬,০২৪ বর্গ কিলোমিটার।
→ ১৯৬০ সালে রাজ্য গঠনের সময় মূল ১৭ জেলার বেশ কয়েকটি বিভাজন পরে বর্তমানে ৩৩ টি গঠন করা হয়েছে। এই জেলাগুলো হল: গান্ধীনগর, আমেদাবাদ, আম্রেলি, বানসকণ্ঠ, ভারুচ, ভবনগর, জামনগর, জুনাগড়, খেদা, কচ্ছ, মেহসানা, পাঁচমহল, রাজকোট, ভদোদরা, সুরেন্দ্রনগর, সুরাট, সবরকণ্ঠ, ডাঙ্গ ও ভালসাদ।
→ গুজরাটের জেলাগুলোর মধ্যে আমেদাবাদ জেলার জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশী এবং কচ্ছের আয়তন সর্বাধিক।
ভূ-প্রাকৃতিক বিভাগ
ভূ-প্রকৃতিগত পার্থক্য অনুসারে গুজরাট রাজ্যকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়,
যেমন : (১) রণ, (২) কচ্ছ উপদ্বীপ, (৩) কাথিয়াবাড় উপদ্বীপ এবং (৪) গুজরাট সমভূমি অঞ্চল।
[১] রণ : গুজরাট রাজ্যের উত্তরে এবং কচ্ছ উপদ্বীপের উত্তর ও পূর্বাংশে ৭৩,৬০০ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত অগভীর জলাভূমিকে রণ (rann) বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য :
(১) কোন এক সময় এই রণ অঞ্চলটি আরব সাগরের একটি উপসাগর ছিল। ভূ- আন্দোলনের ফলে সেই উপসাগরীয় তলদেশ ক্রমশ উঁচু হয়ে গিয়ে এবং লুনী নদীর পলি সঞ্চিত হয়ে স্থানটি অগভীর লবণাক্ত জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে।
(২) রণের উত্তরের অংশ বড়ো রণ (Great Rann) পূর্বের অংশ ছোটো রণ (Little Rann) নামে পরিচিত।
(৩)বর্ষাকালে এই অঞ্চল সমুদ্র এবং লুনি, বাণস প্রভৃতি নদ-নদীর দ্বারা প্লাবিত হয়।
(৪) গ্রীষ্মকালে এই অঞ্চল সম্পূর্ণ শুকনো, উদ্ভিদহীন হয়ে পড়ে ।
(৫) সাদা লবণে আচ্ছাদিত বালুকাময় প্রান্তরে রূপান্তরিত হয়।
[২] কচ্ছ উপদ্বীপ: “কচ্ছ” শব্দের অর্থ 'জলাময় দেশ'।রণের দক্ষিণে কচ্ছ উপদ্বীপ অবস্থিত।
বৈশিষ্ট্য:
১) এই অঞ্চলের উত্তর ও দক্ষিণের সমুদ্র-সংলগ্ন অংশে পলিগঠিত সমভূমি।
২) মধ্যভাগে ৩১৫ থেকে ৩৮৫ মিটার উঁচু বেলেপাথরের পাহাড় দেখা যায়।
[৩] কাথিয়াবাড় উপদ্বীপ : এই অঞ্চল প্রকৃতিতে একটি নবীন শিলা ও লাভাগঠিত মালভূমি। দীর্ঘকাল ভূমিক্ষয়ের ফলে এর উপরিভাগ বর্তমানে সমতল হয়েছে। এই অঞ্চলের পাহাড়গুলোর মধ্যে গির, ওসম, বর্ষা, গিরণর [সর্বোচ্চ পাহাড় এবং গোরক্ষনাথ (উচ্চতা মিটার) গিরণর পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ] প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
[৪] গুজরাট সমভূমি অঞ্চল : গুজরাটের পূর্বাংশের সমভূমি অঞ্চল সবরমতী, মাহী, নর্মদা,তাপ্তী প্রভৃতি সমান্তরাল ও পশ্চিমবাহিনী নদী বাহিত বিপুল পলিরাশি খাম্বাত বা কাম্বে উপসাগরে ক্রমাগত অবক্ষেপিত হওয়ার ফলে এই সমভূমির সীমানা ক্রমশ পশ্চিমদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
খাম্বাত বা কাছে উপসাগর : ভারতের পশ্চিম উপকূলে আরব সাগরের একটি প্রসারিত অংশ খাম্বাত উপসাগর নামে বরোদা ও ভবনগর এর মধ্যবর্তী খাম্বাত পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব দিকে প্রসারিত হয়েছে। খাম্বাত উপসাগর, আরবসাগর এবং কচ্ছ উপসাগর দিয়ে তিন দিকে সমুদ্রবেষ্টিত নীচু মালভূমি ও সমভূমি অঞ্চল কাথিয়াবাড় উপদ্বীপ নামে পরিচিত।
[৩] নদ-নদী ও হ্রদ
→ সবরমতী, মাহী, নর্মদা, তাপ্তী, ভাদর, শত্রুঞ্জয় প্রভৃতি এই রাজ্যের উল্লেখযোগ্য নদী পশ্চিমবাহিনী। এই নদীগুলোর মধ্যে একমাত্র ভাদর নদী ছাড়া (আরব সাগরে পড়েছে) অন্যান্য নদীগুলো খাম্বাত বা কাম্বে উপসাগরে পড়েছে।
১) ভাদর নদী মাওর পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে ১৮৪ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে নবি-বন্দরের কাছে আরবসাগরে পড়েছে।
২) শত্রুঞ্জয় নদী গিরপর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে ও পূর্ব দিকে কাম্বে উপসাগরে পড়েছে।
৩) নর্মদা নদী বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বতের সঙ্কীর্ণ গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রোচের কাছে কাম্বে উপসাগরে পড়েছে।
৪) তাপী নদী সাতপুরা ও অজন্তা পর্বতের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ণ উপত্যকা পার হয়ে সুরাটের কাছে কাছে উপসাগরে পতিত হয়েছে।
৫) সবরমতী নদী আরাবল্লী পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণবাহিনী হয়ে কাম্বে উপসাগরে পড়েছে (এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১৬ কি.মি.)।
৬) মাহী নদীটি বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণী থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম বাহিনী হয়ে কাছে উপসাগরে পড়েছে।
৭) সরস্বতী ও বাগস নামে দুটো ছোট নদী কচ্ছের রণে পড়েছে।
কাথিয়াবাড়ের পূর্ব সীমায় নল সরোবর নামে একটি হ্রদ রয়েছে, যার মাধ্যমে বর্ষাকালের ছোট রণের জল খাম্বাত উপসাগরে পতিত হয়।
[৪] মৃত্তিকা
→ গুজরাটে প্রধানত চার ধরনের মৃত্তিকা দেখা যায়, যেমন:
(১) কৃষ্ণমৃত্তিকা: কচ্ছ, কাথিয়াবাড় ও পূর্ব সমভূমির অপেক্ষাকৃত উঁচু অংশের লাভাজাত কৃষ্ণমৃত্তিকা (কৃষ্ণমৃত্তিকা খুব উর্বর এবং এর জলধারণ ক্ষমতা খুব বেশী;
(২)বেলেমাটি: আরবসাগর এবং কচ্ছ ও খাম্বাত উপসাগরের উপকূল ভাগের পলিমাটি ও বায়ুবাহিত বেলেমাটি বা মিলিওলাইটস (Miliolites) (এই মাটির জলধারণ ক্ষমতা কম হলেও সেচের সাহায্যে কৃষিকাজ করা হয়);
(৩)লবণাক্ত মৃত্তিক: রণ অঞ্চলের মরুজ লবণাক্ত ক্ষার বেলেমাটি (লবণাক্ত এই মৃত্তিকা খুবই অনুর্বর ও কৃষিকাজের অনুপযুক্ত);
(৪) ধূসরবর্ণের বেলেমাটি: কাথিয়াবাড়ের উত্তর-পূর্বের ও কচ্ছের বাকি অংশের ধূসরবর্ণের বেলেমাটি (সাধারণভাবে অনুর্বর হলেও এই মাটিতে জলসেচের সাহায্যে কৃষিকাজ করা যায়)। এই মাটিগুলোর মধ্যে কৃষ্ণমৃত্তিকা অত্যন্ত উর্বর।
[৫] স্বাভাবিক উদ্ভিদ ও বনজ সম্পদ:
ক) গুজরাটের স্বাভাবিক উদ্ভিদ প্রধানত শুষ্ক ও কাঁটাযুক্ত ছোট ছোট গাছ।
খ) কাথিয়াবাড় ও কচ্ছের পূর্ব-উপকূলে সামান্য ঘাস ও ঝোপ জাতীয় গাছ দেখা যায়।
গ) গির ও গিরনর পর্বতমালার বৃক্ষগুলি শুষ্ক পর্ণমোচী জাতীয়।
ঘ) গুজরাটের উপকূলভাগে আর্দ্র পর্ণমোচী বৃক্ষের প্রাচুর্য দেখা যায়। ডাঙ্গ জেলায় সবচেয়ে বেশী বনভূমি চোখে পড়ে। এখানে জেলার মোট আয়তনের ৩০% বনভূমি। আম্রেলী, জুনাগড়, আমেদাবাদ, মহেসনা, সুরাট প্রভৃতি জেলাগুলিতে সংরক্ষিত বনভূমি আছে।
ঙ) ঊষর মরুভূমি সদৃশ রণ অঞ্চলে এখানে সেখানে খয়ের, বাবলা, মনসা, খেজুর, কাঁটাগুল্ম ও ঘাস দেখা যায়। গুজরাট রাজ্যের মোট আয়তনের প্রায় ১০% বনভূমি।
চ) জ্বালানী কাঠ, বাঁশ, বিড়িপাতা ও রজন গুজরাটের প্রধান বনজ সম্পদ। ভারতে একমাত্র গির অরণ্যেই সিংহ আছে।
[৬] জলবায়ু
গুজরাট রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের জলবায়ুর মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়।
ক)মরুভূমির অবস্থানের ফলে উত্তর গুজরাটের জলবায়ু অত্যন্ত চরমভাবাপন্ন (অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম ও শীতকালে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ও শুষ্ক প্রকৃতির।
খ) আরবসাগর এবং কচ্ছ ও খাম্বাট উপসাগরের অবস্থানের ফলে গুজরাটের মধ্য ও দক্ষিণ অংশে আর্দ্র ও সমভাবাপন্ন জলবায়ু দেখা যায়।
গ) শীতকালীন গড় তাপমাত্রা উত্তরে ৮° । দক্ষিণে ১৮° সেলসিয়াস এবং গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা উত্তরে ৪০° ।
ঘ) প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে গুজরাটে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়।
ঙ) দক্ষিণাংশের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৫০ সেন্টিমিটার, অথচ উত্তরাংশে এর পরিমাণ কমে গড়ে প্রায় ৫০ সেন্টিমিটারে দাঁড়ায়।
চ) দেশের অভ্যন্তরভাগে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম ও অত্যন্ত অনিশ্চিত প্রকৃতির।
মন্তব্যসমূহ