দশম শ্রেণী ভূগোল | বারিমন্ডল – জোয়ার ও ভাটা | WBBSE Class 10th Geography Suggestion
এক নজরে
১) প্রধানতঃ চাঁদের আকর্ষণে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়।
২) চাঁদের আকর্ষণের দিকে যে জোয়ার হয়, তাকে মুখ্য জোয়ার এবং এর বিপরীত প্রান্তে যে জোয়ার হয়, তাকে গৌণ জোয়ার বলে।
৩) চাঁদের আকর্ষণের ফলে যে জোয়ারের সৃষ্টি হয়, তাকে চান্দ্র জোয়ার এবং সূর্যের আকর্ষণের ফলে যে জোয়ারের সৃষ্টি হয়, তাকে সৌর জোয়ার বলে।
৪) পৃথিবীর প্রতিটি স্থানে দিনে দু'বার জোয়ার ও দু'বার ভাঁটা হয়।
৫) দু’টি মুখ্য জোয়ার বা গৌণ জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট।
৬) একটি মুখ্য জোয়ার/গৌণ জোয়ার ও একটি গৌণ জোয়ার/মুখ্য জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ১২ ঘণ্টা ২৬ মিনিট।
৭) পৃথিবীর প্রতিটি স্থানে ভাটার সময়ের ব্যবধান ৬ ঘন্টা ১৩ মিনিট।
৮) অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে। এরূপ অবস্থানকে সিজিগি বলে।
৯) প্রতি ১৫ দিন অন্তর ভরা জোয়ার বা তেজ কটাল ঘটে।
১০) অমাবস্যা তিথিতে পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চাঁদ একই সরলরেখায় অবস্থান করে।
১১) পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে।
১২) কৃষ্ণ ও শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মরা জোয়ার বা মরা কটাল হয়।
১৩) পশ্চিমবঙ্গে ভাগীরথী-হুগলী নদী, চীনের ইয়াংসি নদী, ব্রাজিলের আমাজন নদী, ইংল্যণ্ডের ,টেমস নদী প্রভৃতিতে জোয়ার-ভাটা দেখা যায়।
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
[১] জোয়ার-ভাটা খেলে এরূপ একটি নদীর নাম লেখ ?
উঃ হুগলী নদী।
[২] পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব কত?
উঃ ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কি.মি.।
[৩] জোয়ার ভাটা সৃষ্টির মূল কারণ কি?
উঃ চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ।
[s] চান্দ্র জোয়ার ও সৌর জোয়ার বলতে কি বােঝ?
উঃ চাদের আকর্ষণে যে জোয়ার হয় তাকে চান্দ্র জোয়ার এবং সূর্যের আকর্ষণে যে জোয়ার হয় তাকে সৌর জোয়ার বলে।
[5] দুটি মুখ্য জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত?
উঃ ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট।
[৬] দিনে ক'বার জোয়ার-ভাটা হয় ?
উঃ দু’বার জোয়ার ও দু’বার ভাটা।
[৭] দুটি গৌণ জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত?
উঃ ১২ ঘণ্টা ২৬ মিনিট।
[৮] সিজিগি বলতে কি বােঝ?
উঃ পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য একই সরলরেখায় অবস্থান করলে প্রবল জোয়ার ও প্রবল ভাটার সৃষ্টি হয়। এরূপ অবস্থাকে সিজিগি বলে।
[৯] কোন্ তিথিতে তেজকটাল হয়?
উঃ অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে।
[১০] কোন্ তিথিতে মরা কটাল হয়?
উ: অষ্টমী তিথিতে।
১) জোয়ার-ভাটা :
প্রতিদিন নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর সাগর-মহাসাগরের জল এক জায়গায় ফুলে ওঠে বা স্ফীত হয় এবং অন্য জায়গায় জল ধীরে ধীরে নিচে নেমে যায় বা অবনমিত হয়। জলের এই ফুলে ওঠাকে জোয়ার বলে এবং নিচে নেমে যাওয়াকে বলে ভাটা।
২) জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির কারণ :
প্রধানতঃ দু’টি কারণে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়। এগুলি হল—
[১] চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষ শক্তির প্রভাব
[২] পৃথিবীর আবর্তনের ফলে উৎপন্ন কেন্দ্রাতিগ বল।
[১] চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষশক্তির প্রভাব:
মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র প্রভৃতি প্রতিটি জ্যোতিষ্ক পরস্পরকে আকর্ষণ করে। তাই, এর প্রভাবে সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। কিন্তু পৃথিবীর ওপর সূর্য অপেক্ষা চাঁদের আকর্ষণ বল বেশি হয়। কারণ সূর্যের ভর অপেক্ষা চাঁদের ভর অনেক কম (চাঁদ অপেক্ষা সূর্য প্রায় ২৬০ লক্ষ গুণ বড়) হলেও চাঁদ সূর্য অপেক্ষা পৃথিবীর অনেক নিকটে অবস্থিত (পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ৩ লক্ষ ৪৮ হাজার কি.মি. ও পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ১৫ কোটি কি.মি.)। তাই, সমুদ্রের জল তরল বলে চাঁদের আকর্ষণেই প্রধানতঃ সমুদ্রের জল ফুলে ওঠে ও জোয়ার হয়। সূর্যের আকর্ষণে জোয়ার তত প্রবল হয় না। চাঁদ ও সূর্য একই সরলরেখায় অবস্থিত হলে চাঁদ ও সূর্য উভয়ের আকর্ষণে জোয়ার অত্যন্ত প্রবল হয়।
[২] পৃথিবীর আবর্তনের ফলে কেন্দ্রাতিগ বল:
পৃথিবী নিজ মেরুরেখার চারদিকে অনবরত আবর্তন করে বলে কেন্দ্রাতিগ বল বা বিকর্ষণ শক্তির সৃষ্টি হয়। এই কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে পৃথিবীর প্রতিটি অনুই মহাকর্ষশক্তির বিপরীত দিকে বিকর্ষিত হয় বা ছিটকে যায়।তাই, পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে যেখানে মহাকর্ষ শক্তির প্রভাবে জোয়ারের সৃষ্টি হয়, তার বিপরীত দিকে সমুদ্রের জল বিক্ষিপ্ত হয়েও জোয়ারের সৃষ্টি করে।
৩) জোয়ার-ভাটার ফলাফল
[১] অগভীর নদীতে জোয়ারের সময় বড় বড় সামুদ্রিক জাহাজ সহজেই নদীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে।
দৃষ্টান্ত: ভাগীরথী-হুগলী নদীর মধ্যে দিয়ে বড় বড় জাহাজ কেলবমাত্র জোয়ারের সময়ই কলকাতা বন্দরে প্রবেশ করে এবং ভাঁটার টানে ফিরে যায়।
[২] জোয়ার-ভাটার প্রভাবে নদীর জল পরিষ্কার থাকে। ভাটার টানে বিভিন্ন নদী আবর্জনা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।
দৃষ্টান্ত: কলকাতা শহরের আবর্জনাও এইভাবে ভাটার টানে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।
[৩] জোয়ার-ভাটার প্রভাবে নদীর মােহনাতে পলি সঞ্চিত হতে পারে না, নদীখাত গভীর থাকে।
[৪] জোয়ারের ফলে নদীর জল বৃদ্ধি পায়। ফলে নৌ-চলাচলের সুবিধা হয়।
দৃষ্টান্ত: সুন্দরবন অঞ্চলের ছােট ছােট খাড়িগুলি জোয়ারের সময়ই নৌবহনযােগ্য।
[৫] শীতপ্রধান অঞ্চলে নদীর জল জোয়ার-ভাটার প্রভাবে লবণাক্ত হলে নদীর জল অতিরিক্ত ঠাণ্ডাতেও সহজে বরফে পরিণত হয় না। ফলে বন্দরগুলি বরফমুক্ত থাকে।
[৬] যে সব উপকূল অঞ্চলে বা নদী মােহনায় (যেমন- সুন্দরবন খাড়ি অঞ্চলে) জোয়ার অত্যন্ত প্রবল হয়, সেই সব অঞ্চলে জোয়ারের তীব্র স্রোত থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।
দৃষ্টান্ত: তামিলনাড়ুর উপকূল অঞ্চলে এইভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
[৭] জোয়ারের টানে বহু সামুদ্রিক মাছ নদীতে প্রবেশ করে ও ভাটার টানে তা ফিরে যায়। তাই জোয়ার-ভাটার সঙ্গে জেলেদের জীবনযাত্রা ওতপ্রােতভাবে জড়িত।
[৮] অনেক সময় নদীর স্রোত কম থাকলে জোয়ার-ভাটার প্রভাবে নদীগর্ভে পলি সঞ্চিত হয়। ফলে নদীর গভীরতা হ্রাস পায়।
দৃষ্টান্ত: হুগলি নদীর গভীরতা হ্রাসের এটি অন্যতম কারণ।
[৯] জোয়ারের প্রভাবে নদীর জল লবণাক্ত হয়ে যায়। এর ফলে নদীর জল সেচ, পানের অযােগ্য হয়ে পড়ে।
[১০] প্রবল জোয়ারে যে বানের সৃষ্টি হয় তার প্রভাবে উপকূলের ক্ষয়ক্ষতি ঘটে এবং নৌকা, লঞ্চ প্রভৃতি ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মন্তব্যসমূহ