পৃথিবীর জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধির তারতম্যের কারণ :
[Causes of variation in Population Density, Distribution and growth] :
পৃথিবীর জনঘনত্ব এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির তারতম্যের কারণ পৃথিবীর সর্বত্র জনসংখ্যা সমানভাবে বন্টিত নয়। কোথাও ঘনবসতিপূর্ণ আবার কোথাও বিরল। পৃথিবীর মােট ৯০ ভাগ মানুষ স্থলভাগের মাত্র ১০ ভাগ অঞ্চলে বসবাস করে, আর অবশিষ্ট ১০ ভাগ লােক স্থলভাগের ৯০ ভাগ অঞ্চলে বাস করে।
জনবিন্যাসের অসমতার কারণগুলিকে প্রধানত ৩ ভাগে ভাগ করা যায়-
ক) প্রাকৃতিক কারণ (Physical Facotrs): জনসংখ্যার বন্টন ও ঘনত্বে প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলি নিম্নরূপ।
(১) ভৌগােলিক অবস্থান (Geographical location)
মেরু অঞ্চলে (উচ্চ অক্ষাংশে) জলবায়ু অত্যন্ত ঠাণ্ডা, বছরের অধিকাংশ সময় বরফাবৃত থাকে। কৃষিকাজ বা কোনাে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ কম বলে জনবসতি কম। যেমন- গ্রিনল্যান্ড, কানাডা প্রভৃতি। মধ্য ও নিম্ন অক্ষাংশে জনবসতি বেশি। যেমন—ভারত, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশে জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
২) নদনদী ও জল: (River and water)
নদনদী ও হ্রদের ধারে জনবসতি অত্যন্ত ঘন। পাণীয় জল, জলসেচ, পরিবহন, জলবিদ্যুৎ প্রভৃতি কাজের সুবিধার জন্য ঘন জনবসতি দেখা যায়। প্রাচীন সভ্যতাগুলি প্রায় সর্বত্রই নদীমাতৃক।
যেমন—সিন্দুনদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা, নীলনদের তীরে মিশরীয় সভ্যতা, হােয়াংহাে-ইয়াংসিকিয়াং নদীর তীরে চৈনিক সভ্যতা, ইউফ্রেটিস-ট্রাইগ্রিস নদীর তীরে মেসােপটেমিয়া সভ্যতা প্রভৃতি অন্যতম জলপথ ।
হ্রদগুলির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ অঞ্চল (সুপিরিয়র, মিচিগন, হুরন, ইরি, ওন্টারিও), কাশ্মীরের ডাল হ্রদ প্রভৃতি সুপেয় জলের হ্রদের তীরে ঘনবসতি দেখা যায়।
৩) জলবায়ু (Climate) :
যেসব স্থানের আবহাওয়া অতি গরম বা অতি ঠান্ডা অথবা কোনাে কারণে সহ্যের সীমা অতিক্রম করে সেখানে জনবসতি অত্যন্ত বিরল এবং বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করে।
যেমন, আন্টার্টিকা, গ্রিনল্যান্ড প্রভৃতি স্থানে দীর্ঘস্থায়ী শীত এবং স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্মকাল। সূর্যালােকের অভাব, স্কুলের অভাব প্রভৃতি কারণে জনবসতি অত্যন্ত বিরল। আবার অত্যাধিক উষ্ণ অঞ্চলে প্রচুর উত্তাপ, কৃষিকাজে, অসুবিধা, জলের অভাব প্রভৃতি কারণে জনবসতি অত্যন্ত বিরল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সাহারা, থর প্রভৃতি মরুভূমি। বৃষ্টিপাত মানুষের বসতি স্থাপনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে।
৪) ভূ-প্রকৃতি (Landforms) :
পার্বত্য অঞ্চল খাড়া ঢালযুক্ত বন্ধুর পাথরে হওয়ায় চাষ-আবাদ, যােগাযােগ ব্যবস্থা প্রভৃতি কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল হওয়ায় কম ঘনত্ব যুক্ত। সমভূমি অঞ্চলে চাষ-আবাদ, যাতায়াত ব্যবস্তা উন্নত এবং শিল্পের অনুকূল প্রভৃতি কারণে ঘনবসতি যুক্ত।
যেমন—গঙ্গা সমভূমি অঞ্চল , উত্তর আমেরিকার সমভূমি অঞ্চল প্রভৃতি।
আবার মালভূমি অঞ্চলে মধ্যম জনবসতি গড়ে ওঠে যেমন-ব্রাজিলের মালভূমি অঞ্চল প্রভৃতি। দেখা গেছে।
পৃথিবীর মােট জনসংখ্যার ২০% লােক ৫০০ মিটারের এর বেশি উচ্চতায় এবং পৃথিবীর মােট জনসংখ্যার ৫৬% লােক ২০০ মিটারের এর কম উচ্চতার বাস করে।
৫) মৃত্তিকা(Soil):
মৃত্তিকার প্রকৃতি ও গুণমান জনবসতির উপর প্রভাব বিস্তার করে। আবার মৃত্তিকার এই প্রকৃতি নির্ভর করে কোনাে স্থানের জলবায়ু, স্বাভাবিক উদ্ভিদ এবং ভূ-প্রকৃতির উপর।
যেমন অত্যাধিক উষ্ণ অঞলে— বালু মৃত্তিকা, অধিক উচ্চতায় এবং উচ্চ অক্ষাংশে—পডসল মৃত্তিকা, আদ্র ক্রান্তীয় অঞলে—ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা। এই সকল মৃত্তিকা কৃষিকাজের অনুপযুক্ত। আগ্নেয়গিরি অঞলের লাভা মৃত্তিকা (যেমন—জাপান, জাভা প্রভৃতি) ব-দ্বীপ অঞ্চলের পলল মৃত্তিকা (গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ) মধ্য অক্ষাংশীয় নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের চারনােজেম মৃত্তিকা কৃষিকাজের উপযুক্ত, ফলে এখানে ঘন জনবসতি দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যা ব্যবহার করে অনুর্বর ভূমিকেও চাষযােগ্য করে তােলা হচ্ছে।
৬)স্বাভাবিক উদ্ভিদ (Natural Vegetation): আমাজন ও মালয়েশিয়া উভয় নিরক্ষীয় অঞ্চলে অবস্থিত ঘন অরণ্যের জন্য আমাজন অববাহিকায় জনবসতি কম। কিন্তু মালয়েশিয়ায় গভীর বনভূমি না থাকায় জনবসতি গড়ে উঠেছে। সরলবর্গীয় বনভূমি জনবসতির প্রতিকূল হলেও নরম কাঠের জন্য ঘনজনবসতি গড়ে উঠেছে।
৭) খনিজ সম্পদ [Mineral resource): প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিকূল হলেও মূল্যবান খনিজ দ্রব্যের আকর্ষণে অনেক স্থানে জনবসতি গড়ে ওঠে।
যেমন— ভারতের ছােটোনাগপুর মালভূমিতে, সৌদি আরব, ইরাক প্রভৃতি মরুময় দেশে খনিজ তেলকে কেন্দ্র করে ঘন জনবসতি গড়ে উঠেছে।
খ) আর্থ সামাজিক কারণ সমূহ (Social & Economic Factors)
মানুষের জীবনযাত্রা যত জটিল হচ্ছে ততই ভৌগােলিক উপাদানগুলির তুলনায় আর্থ সামাজিক উপাদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১)অর্থনৈতিক কাজকর্ম (Economic Activity) গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ, শিকার, পশুপালনকেই জীবিকা হিসাবে বেছে নেয়। তাই কৃষিক্ষেত্রে, বনভূমি বা তৃণভূমির চারদিকে ঘন জনবসতি লক্ষ করা যায়।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ভারতের গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চল। এসব এলাকার জমি উর্বর এবং মানুষ সহজেই তাদের জীবন ও জীবিকার সংস্থান করতে পারে।
কিন্তু শহরে মানুষের ঘন জনবসতির কারণে সেখানকার বিভিন্ন প্রকার জীবিকার সুবিধা যেমন- শিল্পাঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যে, সরকারি চাকরিতে, শিক্ষা ইত্যাদি।
২) উন্নত কারিগরি (Developed Technology): প্রযুক্তিবিদ্যা একদিকে যেমন শিল্প স্থাপনে এবং তার সম্প্রসারণে সাহায্য করেছে তেমনি বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে গড়ে উঠতে সহায্য করে, জনবসতি বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় - নেদারল্যান্ডের উত্তর উপকূল ভরাট করে কৃষি কাজ এবং শস্য-শ্যামলা গড়ে উঠেছে। ভারতবর্ষে ইন্দিরা খাল খনন করে এবং শুষ্ক কৃষি (Dry Farming) চালু করে বঙ্গবনকে শস্য শ্যামলা করা হয়েছে। সুন্দরবনে জমিকে উদ্ধার করে চাষ করা হচ্ছে। এর ফলে এই সমস্ত কারণে ঘনজনবসতি গড়ে উঠেছে।
৩) সামাজিক নীতি (Social Policy):
কােনাে দেশের সরকারি ও বেসরকারি নীতি জনসংখ্যার বিন্যাসে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ভারতের জনঘনত্ব বদলে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইজরায়েল সৃষ্টি হওয়ার পর পশ্চিম এশিয়ার অনবন্টনে তারতম্য ঘটে। আবার আভ্যন্তরীন ব্যাপারেও বিভিন্ন সরকারি নীতির ফলে জনবন্টনে তারতম্য ঘটে।
উহরণস্বরূপ বলা যায় ভারত সরকারের দুর্গাপুর, বােকারাে স্টিল প্ল্যান্ট তৈরি করার ফলে ওই অঞ্চলে জনবসতি বৃদ্ধি পায়।
৪) সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ (Socio-Cultural Environment):
বর্তমানে মানুষের আর একটি অন্যতম চাহিদা হল সাংস্কৃতিক চাহিদা। তাই শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, পরিবহন ও যােগাযােগ ব্যবস্থার সুবিধাযুক্ত অঞ্চলগুলিতে ঘন জনবসতি লক্ষ্য করা যায়। তাই গ্রামের তুলনায় শহরে জনসংখা বেশি।
গ) ডেমােগ্রাফিক কারণ (Demographic Reason):
প্রজনন হার, মৃত্যু হার ও পরিব্রাজন এই তিন প্রকার জ্যামিতিক উপাদান জনসংখ্যা বন্টনে প্রভাব বিস্তার করে। প্রজনন হার ও মৃত্যুহারে দৈশিক পার্থক্য স্থায়ী ভাবে জনবন্টনে প্রভাব বিস্তার করে। এছাড়া জনগণের অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক পরিব্রাজন জনবন্টনে প্রভাব ফেলে।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় কাজের সুবিধার্থে ভারতবর্ষে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ কলকাতা, মুম্বাই প্রভৃতি স্থানে পরিব্রাজন করে। বিশ্বে প্রথম আফ্রিকা থেকে অদক্ষ শ্রমিক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আমেরিকা ও ইউরােপীয়ান দেশগুলিতে। উপরিউক্ত কারণগুলি ছাড়াও আরও বিভিন্ন প্রকার বিষয় জনবন্টনে প্রভাব বিস্তার করে। যেমন— প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আবার সামাজিক বিপর্যয় ও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—তিব্বত থেকে ধর্মীয় নেতা দালাইলামার নেতৃত্বে বহু তিব্বতী ভারতে এসে স্থায়ী ভাবে আশ্রয় নিয়েছিল।
মন্তব্যসমূহ